Advertisement

কোনো দিন অন্যের ফ্যাশন ফলো করিনি

প্রকাশ: ২ এপ্রিল, ২০২৫

গান গাইছেন রুনা লায়লাছবি: রুনা লায়লার পারিবারিক অ্যালবাম থেকে
গান গাইছেন রুনা লায়লাছবি: রুনা লায়লার পারিবারিক অ্যালবাম থেকে

স্টার জলসার জনপ্রিয় টক শো ‘ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানি’তে কলকাতার প্রয়াত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ একবার আমার কাছে জানতে চেয়েছিল, আমার ফ্যাশন স্টাইলগুলো কীভাবে আমি ক্রিয়েট করতাম।

বলেছিলাম, এটা আমি সচেতনভাবে করিনি। আমি সাধারণ পোশাকই পরতাম।

শুধু ঋতুপর্ণ ঘোষ একাই নয়, বিভিন্ন সময়ই আমাকে শুনতে হয়, আমি নাকি ‘স্টাইল আইকন’। লোকে আমাকে কেন স্টাইল বা ফ্যাশন আইকন বলে জানি না, তবে বললে আমি আনন্দ পাই। লোকে যে এত বছর আগের রুনাকেও মনে রেখেছে, তার পোশাক, গয়নাগাটি থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে, ভাবলে ভালো লাগে।

ছোটবেলা থেকেই সাজগোজের শখ ছিল। মা চুল বেঁধে দিত। পোশাক কিনে দিত। আমাদের জামাকাপড়গুলো অন্যদের মতোই সাধারণ। তারপর স্কুল থেকেই পেশাদার শিল্পী হিসেবে গান গাওয়া শুরু। গান গাইতে কোথাও গেলে ফ্রক পরে যেতাম। বাড়ি থেকে মেকআপ করার অনুমতি ছিল না। শুধু টিভি অনুষ্ঠান হলে মেকআপ দেওয়ার অনুমতি ছিল।

করাচিতে একটা অনুষ্ঠানে প্রথম স্পনসর হিসেবে একটি ব্র্যান্ডের কাপড় নিয়েছিলাম। অনুষ্ঠানের নাম ‘বাজমি লায়লা’। ওই অনুষ্ঠানে পাঁচটি গান গেয়েছিলাম। সেটা আবার আমিই উপস্থাপনা করেছিলাম। পাঁচটা গানে পাঁচ রকমের পোশাক পরেছিলাম। একবার শাড়ি, একবার ম্যাক্সির মতো একটা পোশাক, একবার জিনস। আর ছিল সালোয়ার–কামিজ। প্রতিটি ড্রেসের সঙ্গে মানানসই মেকআপ নিয়েছিলাম। চুলের স্টাইলও করেছিলাম একটু ভিন্ন। এরপর যত অনুষ্ঠান করেছি, সব নিজের মতো করে সেজেছি। সেই থেকে মনে হয় নিজের অজান্তেই একটা স্টাইল হয়ে গেছে।

কোনো দিন ফ্যাশন ফলো করিনি। আমি আমার ফ্যাশন ফলো করি। আমাকে যেটা মানায়, সেটাই পরি। যখন যেটা ভালো লেগেছে, সেটাই কিনেছি, পরেছি। আসলে ফ্যাশন সম্পর্কে জ্ঞান থাকাটাই সবচেয়ে বড় কথা। আমাকে কোন ড্রেসটা মানাচ্ছে বা মানাবে, ভাবতে হবে; সেই মতো কাপড় নির্বাচন করে পরব। অন্যের ফ্যাশন ফলো করে নিজে স্টাইল করব, এমনটা আমি করিনি। কখনো কোনো ম্যাগাজিন খুলে দেখিনি, এখন কী ট্রেন্ড চলছে, কোন শাড়ি আসছে।

এখন তো সব জায়গাতেই শাড়ি পরি। এ ছাড়া বিশেষ কিছু পরি না। এটাকে কি ‘ফ্যাশন স্টেটমেন্ট’ বলা যায়? ঠিক জানি না। অনেক সময় অনেকে এসে জিজ্ঞেস করে, এটা কী শাড়ি? আমি বলতে পারি না। কারণ, শিফন জর্জেট ছাড়া অন্য কোনো শাড়ি আমি চিনি না। অত গভীরে আমি যাই না। যেটা ভালো লাগে, আমার বাজেটের সঙ্গে মিলে যায়, সেটাই কিনি।

আমি কখনো ৪০ হাজার, ৫০ হাজার টাকার শাড়ি কিনিনি। অযথা টাকা নষ্ট করাটা আমি পছন্দ করি না। আমি কম টাকার কাপড় কিনে বাকি টাকাটা অন্যকে দিয়ে হেল্প করতে পারলেই আনন্দ পাই। এখনো খুব দামি কাপড় পরি না। যেগুলো পরি, সেগুলো অত দামি না কিন্তু মনে হয় অনেক দামি।

আমার মেয়ে তানির যখন বাগ্‌দান হয়, মনে আছে, আংটিবদল অনুষ্ঠানটি হোটেল সোনারগাঁওয়ে হয়েছিল। সে অনুষ্ঠানে একটা শাড়ি পরেছিলাম। সবাই দেখে বলল, খুব সুন্দর শাড়ি, নিশ্চয়ই খুব দামি।

বললাম, দামি না খুব, দাম শুনলে তোমরা অবাক হবে।

শুনে সবারই আগ্রহ বেড়ে গেল, কত দাম?

বললাম, পনেরো শ রুপি।

দাম শুনে সবাই অবাক, হতেই পারে না। আপনি বানিয়ে বলছেন। পনেরো শ রুপির শাড়ি আপনি পরবেন! দেখে মনে হচ্ছে পনেরো হাজার টাকার শাড়ি।

আসলে অল্প দাম, দেখতে সুন্দর, মানানসই কাপড়—এটাই তো আমি কিনব। এটার দাম পনেরো শ–ই, তোমরা বিশ্বাস করো আর না করো, আমার কিচ্ছু করার নেই।

নিজের স্টাইল নিজেই তৈরি করি। ফ্যাশন আইকন হব, এটা ভেবে পোশাক পরি না। শাড়ির সঙ্গে গয়না কী হবে, চুলের স্টাইল কী হবে, নিজেই ঠিক করি। আমার মনে হয়, সবাই যদি নিজস্ব স্টাইল করে, সেটাই ভালো। ফ্যাশন সেন্স সবারই থাকে, কারও হয়তো কম, কারও বেশি। নিজস্বতা দিয়ে কোনো স্টাইল করলে সেটা দেখতেও ভালো লাগে। আবার দিন দিন নিজের জ্ঞানও সমৃদ্ধ হয়।

ঈদের অনুষ্ঠানগুলোতে সাধারণত পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই থাকি। সেই সময় সালোয়ার–কামিজ পরি। নতুন কাপড় কিনতেই হবে, সেটা কখনো ভাবি না। ঈদে কখনো নিজের জন্য কেনাকাটা করি না, তবে পরিবারের জন্য কিনি। কেনাকাটা যখন করা দরকার, বেশির ভাগ সময় কোনো বড় মলে গিয়ে সেরে ফেলি। আর এখন তো অনলাইন আছে, সেখানেও কেনাকাটা করি।

বছর দুই আগে ভারতের জনপ্রিয় ডিজাইনার সব্যসাচী মুখোপাধ্যায়ের একটি ঘটনা আমাকে অবাক করে। আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় এই ডিজাইনার আবার আমার গানের ভক্ত। বিভিন্ন সময় তার সঙ্গে কথাও হয়েছে। তবে ২০২৩ সালে মুম্বাইয়ে তার নতুন স্টোর চালু করে আমাকে সে চমকে দিয়েছিল। সে আমাকে জানাল, মুম্বাই স্টোরে সে একটি ফলক লাগিয়েছে। সেই সঙ্গে আমার চান্দবালির অনুপ্রেরণায় বানিয়েছে গয়না। ছবি তুলেও সে পাঠাল।

বিষয়টি আমার জন্য সম্মানেরই। তার মতো একজন প্রতিভাবান ডিজাইনার আমার স্টাইল ছোটবেলা থেকে মনের মধ্যে পুষে রেখেছে, শুনে ভালো লেগেছিল।

অনুলিখন: কবির বকুল

Lading . . .