মফস্সলের সিনেমা হল ‘সোনালী টকিজ’ কেমন ছিল, এখন কেমন
প্রকাশ: ৩ এপ্রিল, ২০২৫

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ১৯৭০ সালে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌর বাজারে একটি সিনেমা হল প্রতিষ্ঠা হয়। নাম দেওয়া হয় ‘সোনালী টকিজ’। গ্রামের নানা বয়সী নারী-পুরুষ এই হলে সিনেমা দেখতেন। সিনেমার গল্পে আনন্দ–বেদনায় ভাসতেন। দর্শকদের করতালি আর উল্লাসে মুখর থাকত সিনেমা হলটি; কিন্তু ৫৫ বছরের পুরোনো এই সোনালী টকিজের সোনালি দিন এখন শুধুই অতীত।
ঈশ্বরগঞ্জ পৌর বাজারের মাছমহাল এলাকায় সোনালী টকিজ সিনেমা হলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আবদুস সামাদ মিয়া। তিনি বাংলাদেশ সিনেমা হল মালিক সমিতির সভাপতি ছিলেন। ২০১৭ সালে মারা যান তিনি। ১৯৭০ সালে ১৫ শতাংশ জমিতে সিনেমা হলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা আশপাশের কয়েকটি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় পর্দার সিনেমা হল ছিল।
কেমন চলছে সিনেমা হলটি, তা জানতে মঙ্গলবার বিকেলে সিনেমা হলটি ঘুরে দেখা গেছে, ঈদ উপলক্ষে শাকিব খান অভিনীত ‘বরবাদ’ সিনেমা প্রদর্শিত হচ্ছে হলটিতে। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে সিনেমা হলের সামনে যেতেই তরুণ দর্শকদের ভিড় দেখা যায়। টিকিট কাটতে তাঁদের হুড়াহুড়ি করতে দেখা যায়।
হল কর্তৃপক্ষ জানায়, এই সিনেমা হলটিতে প্রথম, দ্বিতীয়, ডিসি ও ব্যালকনি—এই চার ক্যাটাগরিতে ৬০০ দর্শকের ধারণ ক্ষমতা রয়েছে; কিন্তু বর্তমানে শুধু ডিসি ও ব্যালকনিতে ১৮০টি টিকিট ১৫০ টাকা করে বিক্রি করা হয়। প্রতিদিন দুপুর সাড়ে ১২টায় প্রথম শো, বেলা সাড়ে তিনটায় দ্বিতীয় শো ও সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় নাইট শোতে সিনেমা প্রদর্শিত হয়।
বাংলা সিনেমা এখন ঈদকেন্দ্রিক জানিয়ে দর্শক শরীফুল আলম বলেন, ঈদে বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করে বড় পর্দায় সিনেমা দেখতে এসেছেন। আগে প্রায়ই হলে সিনেমা দেখলেও এখন সব সিনেমা ইউটিউবে দেখেন। তাই আর সিনেমা হলে আসা হয় না তাঁর।
ময়মনসিংহের ১৩টি উপজেলায় সিনেমা হল ছিল মোট ৪০টি। ২০০২ সালের ৭ ডিসেম্বরে বোমা হামলায় একযোগে কেঁপে উঠেছিল ময়মনসিংহের চারটি সিনেমা হল—ছায়াবাণী, অজন্তা, অলকা ও পূরবী। এই হামলায় নিহত হন ১৭ জন। আহত হন দুই শতাধিক। সিনেমা হলে বোমা হামলার পর আতঙ্কে সিনেমা হলগুলোতে দর্শক কমতে শুরু করে। ধীরে ধীরে দর্শক–সংকটে ধুঁকতে থাকা সিনেমা হলের অনেকগুলো বন্ধ হতে থাকে। ময়মনসিংহ শহরে টিকে আছে কেবল ছায়াবাণী সিনেমা হলটি।
হলে এসে একসময় নিয়মিত সিনেমা দেখতেন আঠারবাড়ী এলাকার মোজাম্মেল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মানসম্মত সিনেমা হয় না। মুঠোফোনে পছন্দমতো সিনেমা দেখা যায়। এ কারণে এখন আর হলে আসা হয় না তাঁর। তবে হলে সিনেমা দেখার মতো ভালো লাগা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
দুই দশক আগেও হলে নতুন সিনেমা এলে গ্রামে গ্রামে মাইকিং করা হতো। সিনেমার লিফলেট ও পোস্টার সাঁটানো হতো এলাকায়। আকর্ষণীয় কণ্ঠের মাইকিং দর্শকদের টানত সিনেমা হলে। গ্রামের যে সংখ্যক সাধারণ মানুষ সিনেমা দেখতে আসতেন, এখন তার ১৬ ভাগের ১ ভাগ লোকও আসেন না, এমনটাই কর্তৃপক্ষের ভাষ্য।
দর্শকশূন্যতার মধে৵ টিকে থাকা চ্যালেঞ্জের জানিয়ে সোনালী টকিজের প্রয়াত মালিকের ছেলে আবদুল হক বলেন, আশপাশের সব সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। তবুও টিকে আছে এটি। ২০০২ সালে সিনেমা হলে বোমা হামলা, ইউটিউব ও ডিশ লাইনের কারণে মানুষ সিনেমা হলে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন।
সিমেনা হলের নিচেই গবাদিপশুর ওষুধ ও খাদ্য বিক্রি করেন আবদুল হক। দোকানে বসে বললেন তাঁদের সিনেমা হলের অতীত ও বর্তমানের কথা। তিনি বলেন, ঈদ ছাড়া দুই-চারজন লোক হয়। যে টাকা দিয়ে সিনেমা কিনে আনা হয়, তা প্রদর্শন করে খরচ ওঠে না। অন্য ব্যবসা থেকে ভর্তুকি দিয়ে সিনেমা হল টিকিয়ে রেখেছেন। বাবার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে এই চেষ্টা তাঁর।
আবদুল হক বলেন, গত বছর ঈদে শাকিব খানের ‘তুফান’ সিনেমায় দর্শক হয়েছিল। মাঝখানে সারা বছর দর্শক ছিল না। এবার ঈদে শাকিব খানের বরবাদ সিনেমা দেখতে দর্শক আসছেন। দুই ঈদে হল ভালো চলে। শাকিবের সিনেমা ছাড়া অন্য সিনেমায় দর্শক আসেন না।